এসটি মাতুব্বর , মাদারীপুর :
সরকারি দায়িত্ব পালনে মাঠে ছুটতে হয় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীদের। ইউনিয়নের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত, এক ইউনিয়ন থেকে অন্য ইউনিয়ন কিংবা উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কর্মসূচিতে যেতে নিয়মিতই করতে হয় যাতায়াত। এ কাজে নিজেদের পকেট থেকে খরচ করা অর্থ নিয়ম অনুযায়ী টিএডিএ (ট্রাভেলিং অ্যান্ড ডেইলি অ্যালাউন্স) বিলের মাধ্যমে ফেরত পাওয়ার কথা। কিন্তু সেই বৈধ পাওনা তুলতেই মাদারীপুরের সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ‘কমিশন’ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, টিএডিএ বিলের টাকা কর্মীদের ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পর ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে মোট বিলের একটি অংশ পাঠাতে বলা হয়। কেউ কেউ কার্যালয়ের আশপাশে থাকলে নগদেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দাবি, দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর ধরে এভাবে অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুর জেলায় ২৬৪টি পরিবার কল্যাণ সহকারী পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৪৮ জন। ৯৬টি পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা পদের বিপরীতে কর্মরত ৩১ জন এবং ৫৯টি পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক পদের বিপরীতে কর্মরত ৫৫ জন। এ ছাড়া অফিস সহায়ক ও গার্ডের ২০টি পদের বিপরীতে ১৩ জন এবং ৩৬টি আয়া পদের বিপরীতে ২৮ জন কর্মরত রয়েছেন।
জনবল সংকটের মধ্যেও মাঠপর্যায়ের সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন কর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনে নিজেদের অর্থ খরচ করার পর সেই খরচের সরকারি ভাতা পেতেও যদি ‘কমিশন’ দিতে হয়, তাহলে টিএডিএ বিল দেওয়ার উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
‘কমিশনের টাকা আমি সংগ্রহ করে দিই’
কালিকাপুর ও পেয়ারপুর ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন কমিশন দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী, পরিদর্শক ও কর্মচারীদের টিএডিএ বিলের টাকা থেকে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সংগ্রহ করে তিনি সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী কালিদাস মজুমদারের কাছে পৌঁছে দেন।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আমরা দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এই কমিশন দিয়ে আসছি। এটা সরকারের কোনো নিয়ম আছে কি না, আমি জানি না। টিএডিএ বিল আমাদের হিসাবে ঢোকার পর ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা বিকাশে দিতে হয়। ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী-কর্মচারীদের কাছ থেকে কমিশনের টাকা আমি সংগ্রহ করে হিসাব সহকারী কালিদাস মজুমদারকে দিই। পরে তিনি উপরের স্যারদের দেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে কাজ করি, প্রতিদিন পকেট থেকে টাকা খরচ করতে হয়। সেই টাকার ওপর আবার কমিশন দিতে হলে আমরা আসলে টিএডিএ বিল নিয়ে লাভ কী?”
‘না দিলে দূরে বদলির ভয় দেখানো হয়’
স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা খাদিজা আক্তারের অভিযোগ, এভাবে টাকা নেওয়ার কোনো সরকারি নিয়ম নেই—এটি তাঁরা জানেন। কিন্তু চাকরির স্বার্থে অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকা দেন।
তিনি বলেন, “আমরা জানি এভাবে টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু চাকরির ভয়েই এতদিন দিয়ে আসছি। তারা কিছু বললেই দূরে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়। আমরা চাই, সরকার বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিক।”
অভিযোগকারীদের দাবি, সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের দুই শতাধিকের বেশি কর্মী কোনো না কোনোভাবে এই ব্যবস্থার ভুক্তভোগী। তাঁদের অনেকেই নাম প্রকাশ করতে চান না। কারণ, অভিযোগ করলে বিল আটকে রাখা, দূরের কর্মস্থলে বদলি কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
‘বিল আটকে থাকে, শেষ পর্যন্ত দিতে হয়’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, “আমরা মাঠে কাজ করি, নিজের টাকায় যাতায়াত করি। কিন্তু বিল তুলতে গেলেই নানা অজুহাতে বিল আটকে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে কমিশন দিতে হয়। না দিলে মাসের পর মাস বিল ঝুলে থাকে।”
আরেক কর্মচারীর ভাষ্য, “এটি এখন অনেকটা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন না দিলে বিল সহজে ছাড় হয় না। চাকরি বাঁচাতে আমরা অনেকেই প্রতিবাদ করতে পারি না।”
কালকিনিতেও কমিশন নেওয়ার অভিযোগ
শুধু সদর নয়, কালকিনি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কর্মীদের কাছ থেকেও টিএডিএ বিলের ওপর কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্বাস্থ্যকর্মী সোহেল হোসেন, আকলিমা ও নুসরাত ফারুক হোসেনসহ কয়েকজন অভিযোগ করেন, তাঁদের কাছ থেকেও টিএডিএ বিলের টাকা থেকে কমিশন নেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্যকর্মী দাবি করেন, কালকিনিতে টিএডিএ বিলের কমিশনের টাকা উপজেলা হিসাব সহকারী সুমন গাঙ্গুলীর কাছে দিতে হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কালকিনি উপজেলা হিসাব সহকারী সুমন গাঙ্গুলী বলেন, “আমি এ ধরনের বিল কাউকে করে দিই না। এখন বিল হয় অনলাইনে। যদি কেউ আমার বিরুদ্ধে বলে থাকে, সেটা মিথ্যা।”
কালকিনি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহমান বলেন, “আমার অফিসের কোনো কর্মচারী টিএডিএ বিলের ওপর কারও কাছ থেকে কমিশন নিয়ে থাকলে সে বিষয়ে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
হিসাব সহকারী: ‘স্যারের কাছে যান’
অভিযোগের বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী কালিদাস মজুমদারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমার কোনো কথা নাই। আপনারা স্যারের কাছে যান। আমি কিছু বলতে পারব না। যা কিছু হয়েছে, স্যারের মাধ্যমেই হয়েছে।”
সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সানজিদা বলেন, “এ বিষয়ে আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভিডিও বক্তব্য দিতে পারব না। এরকম যদি কেউ করে থাকে, তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
‘কমিশন নেওয়ার কোনো সরকারি নিয়ম নেই’
অভিযোগের বিষয়ে মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, “টিএডিএ বিলের ওপর কোনো কমিশন নেওয়ার সরকারি নিয়ম বা বিধান নেই। যদি কেউ নিয়ে থাকে, অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রশ্ন—টিএডিএ বিলের ওপর কমিশন নেওয়ার কোনো সরকারি বিধান না থাকলে প্রায় ১৬ বছর ধরে কার নির্দেশে, কীভাবে এবং কার কাছে এই টাকা গেছে? অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা উদঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের ভাষ্য, “আমরা দয়া চাই না, নিজেদের প্রাপ্যটাই চাই।”