রোকনুজ্জামান পারভেজ, শরীয়তপুর
নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে নতুন করে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিয়েছিলেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বাঁশতলা এলাকার কয়েকটি পরিবার। কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন, কেউ কিস্তিতে টাকা তুলে কিনেছেন সামান্য জমি। সেই জমিতে ঘর নির্মাণ করেও শেষ পর্যন্ত সেখানে বসবাস করতে পারছেন না তারা। প্রশাসনের লোকজন গিয়ে নির্মাণাধীন ঘর ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বাঁশতলা এলাকায় নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো শতাধিক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারি উদ্যোগে স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হওয়ায় কয়েকটি পরিবার নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী জমি কিনে ঘর তৈরির উদ্যোগ নেয়। কিন্তু একই দাগে সরকারি খাসজমি থাকায় প্রশাসন তাদের নির্মাণকাজে বাধা দেয় এবং কয়েকটি স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী মজনু ব্যাপারী, চুন্নু শিকারি, রিয়াজ ব্যাপারী, হালিমা বেগম ও আক্তার মোল্লাসহ কয়েকজন জানান, দীর্ঘদিন ভাড়া বাসায় থাকার পর এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তারা নিজেদের নামে জমি কিনেছেন। সেই জমিতে ঘর নির্মাণ শুরু করলে প্রশাসনের লোকজন গিয়ে ঘর ভেঙে দেন।
মজনু ব্যাপারী বলেন, “আমরা নদীভাঙনে সব হারিয়েছি। অনেক কষ্টে ঋণ করে জমি কিনেছি। ভাড়া বাসা থেকেও এখন চলে যেতে বলা হচ্ছে। নিজের কেনা জমিতে ঘর তুলতে গিয়েও বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা এখন কোথায় যাব, কীভাবে থাকব—কিছুই বুঝতে পারছি না।
জমি বিক্রেতা শফিকুর রহমান বেপারী বলেন, আমি বি আর এস নামজারি করে সরকারি খাজনা পরিষদ করে আমার জমিনের কিছু পরিমাণ জমি ভাঙ্গন কবলিত মানুষের কাছে কম দামে বিক্রি করেছি । তাদের থাকার কোন আবাসভূমি না থাকায় আমি নামে মাত্র কিছু টাকা নিয়ে তাদের কাছে এই জমি বিক্রি করে থাকি এখন সেখানে আমাকে সহ সরকারিভাবে তাদেরকে বাধা প্রদান করা হচ্ছে । জমি বিক্রিকরে তাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী বলেন, “সরকার আমাদের থাকার জন্য কোনো ঘর দেয়নি। আমরা কিস্তিতে টাকা তুলে জমি কিনে ঘর করছিলাম। সেই ঘরও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমাদের দাবি, আমরা যে জমি কিনেছি, সেখানে যেন ঘর নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি খ তোফসিলের ছিলেন জমি থাকলেও তাদের ক্রয় করা জমিতে ঘর নির্মাণে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এতে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তবে প্রশাসনের দাবি, সরকারি জমির ওপর যাতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ না হয়, সে কারণেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নড়িয়া ভূমি অফিসের তহশিলদার ইমরান হোসেন বলেন, ৮৪ ও ৮৫ নম্বর দাগে মোট ৭৪ শতাংশ জমি সরকারি খতিয়ানভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে অনেক জমি নদীর মধ্যে চলে গেছে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু মানুষ সরকারি জমির মাঝামাঝি অংশে স্থাপনা নির্মাণ করছিলেন। এ কারণে তাদের বাধা দেওয়া হয়েছে এবং জানানো হয়েছে ।
এই দাগে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বেশিরভাগ জমিই ব্যক্তিমালিকানাধীন। তবে সরকারি বিধি অনুযায়ী আগে সরকারি জমি চিহ্নিত ও বাদ দেওয়ার পরই সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে।”
নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো এসব পরিবারের এখন একটাই দাবি—তাদের মালিকানাধীন জমি যাচাই করে সেখানে নিরাপদে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হোক। পাশাপাশি যেসব পরিবার প্রকৃত অর্থে ভূমিহীন ও গৃহহীন, তাদের সরকারি পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় এনে স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, নদীভাঙনে সব হারিয়ে যদি নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ ও ঋণের টাকায় সামান্য জমি কিনেও ঘর তুলতে না পারেন, তাহলে তাদের আশ্রয় হবে কোথায়?