
মহসিন সরদার শরীয়তপুর প্রতিনিধি :
রবিবার( ৯ আগস্ট) পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট ১৯ কর্মকর্তার প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর পরও শরীয়তপুরে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্ত সংলগ্ন এলাকায় থামেনি অবৈধ বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ড্রেজার বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করছে। প্রশাসন ও নৌ-পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলা এই কার্যক্রমে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তীর ভাঙন এবং পদ্মা সেতুর প্রভাব এলাকায় ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।
সম্প্রতি জনস্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. গোলাম রহমান ভূইয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট ১৯ জন কর্মকর্তার কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। নোটিশে পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, নদী ভাঙন রোধ এবং পদ্মা সেতুকে সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, নোটিশ পাঠানোর পরও জাজিরা, নাওডোবা জিরো পয়েন্ট ও আশপাশের এলাকায় রাতের বেলায় ড্রেজার মেশিন চালিয়ে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।
রাত নামলেই শুরু হয় বালু উত্তোলন
স্থানীয় সূত্র জানায়, দিনের বেলায় নদীতে তেমন তৎপরতা না থাকলেও গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত একাধিক ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা হয়। পরে ট্রলার ও বাল্কহেডে করে সেই বালু বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, “রাতভর ড্রেজারের শব্দ শোনা যায়। অভিযানের খবর পেলেই ড্রেজার সরিয়ে ফেলা হয়। আবার কিছু সময় পর আগের মতো বালু তোলা শুরু হয়। মনে হয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা যেমন সেতু, বাঁধ, কালভার্ট ও তীর রক্ষা প্রকল্পের আশপাশে বালু উত্তোলন আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। কারণ অপরিকল্পিতভাবে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং তলদেশে অস্বাভাবিক গর্ত সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের দাবি, পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্ত সংলগ্ন এলাকায় বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। এতে নদীতীর রক্ষা বাঁধের ওপর চাপ বাড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে সেতুর প্রভাব এলাকায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে তীর ভাঙন বৃদ্ধি, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং অবকাঠামোর স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ভাঙনের মুখে কৃষিজমি ও বসতভিটা
লিগ্যাল নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, পদ্মা নদী থেকে অপরিকল্পিত ও অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে শরীয়তপুর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া ও পাবনাসহ নদীতীরবর্তী এলাকায় প্রতিবছর শত শত হেক্টর ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
শরীয়তপুরের জাজিরা, নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষ জানান, নদী ভাঙনের কারণে ইতোমধ্যে অনেক পরিবার তাদের জমি ও বাড়িঘর হারিয়েছে। এখন আবার নতুন করে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় তারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
চরাঞ্চলের এক কৃষক বলেন, “নদীর পাড় আগের চেয়ে দ্রুত ভাঙছে। যদি এভাবে বালু কাটা চলতে থাকে, তাহলে আমাদের বসতভিটা টিকবে না।”
প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালিত হলেও তা নিয়মিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। প্রশাসনের অভিযান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার বালু উত্তোলন শুরু হয়।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধু কয়েকটি ড্রেজার জব্দ বা শ্রমিক আটক করে সমস্যার সমাধান হবে না। অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
লিগ্যাল নোটিশে ১৫ দিনের আল্টিমেটাম
আইনজীবী মো. গোলাম রহমান ভূইয়া জানান, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিনের মধ্যে পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, নদী ভাঙন রোধ এবং পদ্মা সেতুকে সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বালু উত্তোলনের ফলে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন, তীর রক্ষা বাঁধে ভাঙন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই বিষয়টি শুধু পরিবেশগত নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
পরিবেশ ও জীবিকার ওপর প্রভাব
জেলেরা জানান, ড্রেজারের কারণে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মাছের পরিমাণ কমে গেছে। এতে নদীর ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবারের জীবিকা সংকটে পড়ছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত নজরদারি, ২৪ ঘণ্টা নদী টহল, ড্রেজার জব্দ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
এখনই ব্যবস্থা না নিলে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা
স্থানীয়দের মতে, পদ্মা সেতুর পাশেই যদি রাতের আঁধারে অবৈধ বালু উত্তোলন চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে নদী ভাঙন, চরাঞ্চলের জনপদ, কৃষিজমি, তীর রক্ষা বাঁধ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তাদের দাবি, পদ্মা নদীকে অবৈধ বালু দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রশাসন, নৌ-পুলিশ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সেতু কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী চক্রকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসন ইতিপূর্বে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন , নৌ-পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি রয়েছে বলে জানান তারা ।